Chattogram Songlap
ছোট পুঁজি বড় স্বপ্ন

ছোট পুঁজি বড় স্বপ্ন

চাকরির বাজারে এখন প্রতিযোগিতা ভীষণ। আবার ব্যবসা করতে চাইলে লাগে অনেক মূলধন, এমন ধারণা অনেকেরই। আসলেই কী তাই? এমন ধারণা পাল্টানোর সময় এসেছে। এখন স্বল্প পুঁজি দিয়েই শুরু করা যায় ছোটখাটো অনেক ধরনের ব্যবসা। এতে আত্মকর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়, আবার ব্যবসায়ের প্রসার হলে নিশ্চিত হয় অনেকের কর্মসংস্থান। এমনই ছোট পরিসরের কিছু ব্যবসায়ের ক্ষেত্র নিয়ে আজকের আয়োজন। এরমধ্যে কয়েকটি চট্টগ্রামে অনেকদিন ধরেই বেশ জনপ্রিয়। কয়েকটি নতুন। আবার বাজার ও চাহিদা অনেক বড় হওয়া সত্ত্বেও দু’একটি ব্যবসায়ে এখনও সেভাবে এগিয়ে আসেননি নগরীর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।

ছোট পরিসরে হোক শুরু: ক্ষুদ্র ব্যবসা, বিশেষ করে মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে যারা ব্যবসা শুরু করেছেন এমন কয়েকজন উদ্যোক্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, এক্ষেত্রে প্রথমেই বেছে নিতে হবে এমন ব্যবসা যা কম পুঁজিতে বাসায় বসেই করা যায়। এক্ষেত্রে মেধার সাথে সৃজনশীলতার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। অবসর সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। সাফল্য একদিনে আসে না, তাই আস্তে আস্তে নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করতে হবে। ক্ষুদ্র পুঁজিকে আস্তে আস্তে বড় ব্যবসায় কাজে লাগানোর উপযোগী করতে হবে। সমগ্র চট্টগ্রামকে কয়েকটি জোনে বিভক্ত করে বাজার প্রসার ঘটানো যায়। তবে মূল বাজারটা বাসার পাশেই হবে। নতুন নতুন আইডিয়াকে ব্যবসায়িক লাভের ভিত্তিতে সামগ্রিকভাবে কাজে লাগাতে হবে।

ক্যাটারিং সার্ভিস

আজকাল স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন অফিসে লাঞ্চ টাইম এবং নাস্তার সময়ে সবাই বাড়িতে তৈরি ফ্রেশ খাবার খেতে চায়। অথচ বাড়ি থেকে টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার নিয়ে যাওয়া তারপর ঠিক সময়ে বের করে খাওয়ায় রয়েছে অনেক ঝামেলা। আবার গরমে খাবার নষ্ট হয়েও যেতে পারে। বাড়ির ফ্রেশ খাবার যারা অফিসে বসে খেতে চান কিন্তু টিফিন বক্স বয়ে বেড়াবার ঝামেলায় যেতে চান না, তাদের জন্য চট্টগ্রামে এখন চালু হয়েছে বেশ কিছু হোম মেইড ক্যাটারিং হাউস। এসব হাউস থেকে কম খরচে ফ্রেশ খাবার পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে দুপুরের লাঞ্চে বা বিকেলের নাস্তায় অফিসে বসেই বাড়ির খাবারের স্বাদ উপভোগ করার ব্যবস্থা যারা করছে, তাদের অধিকাংশই মহিলা। তবে অল্প পুঁজি নিয়ে নারী-পুরুষ যে কেউ ভালো আয়ের একটি উৎস হিসেবে এ কাজে হাত লাগাতে পারেন। এ ব্যবসায় খুব বেশি পুঁজির প্রয়োজন নেই। পাঁচ-ছয় হাজার টাকা আর কিছু ভালো খাবার তৈরির হাত থাকলেই সফল হতে পারবেন। এই ব্যবসায় যেসব অফিস বা স্কুলে আপনি খাবার সরবরাহ করতে ইচ্ছুক, সেখানে যোগাযোগ করে জেনে নিন খাবার সরবরাহের সুযোগ আছে কি-না। সুযোগ থাকলে কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানুন, দুপুরের লাঞ্চে বা বিকেলের নাস্তায় তারা কী খাবার খেতে পছন্দ করে। প্রথম পাঁচ-ছয়জন গ্রাহককে সন্তুষ্ট করে নিয়মিত খাবার সরবরাহ করার অর্ডারটা নিয়ে নিন। ভালো খাবার সরবরাহ করতে পারলে আপনাকে আর কষ্ট করে বিজ্ঞাপনের কাজটি ঘুরে ঘুরে করতে হবে না। ভালো খাবারের সুনাম সবাই করে, দেখবেন পাঁচ-ছয়জন গ্রাহক থেকে আপনার সুনাম আরো পাঁচ-ছয়জনের কাছে ছড়িয়ে পড়েছে। এভাবে মাস খানেকের মধ্যে ব্যবসাকে লাভজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার মত গ্রাহক পেয়ে যাবেন।

মোমবাতি তৈরি

মোমবাতি আমাদের সবার কাছে একটি অতিপরিচিত নাম। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগেও মোমবাতির কদর এতটুকু কমেনি বরং অব্যাহত লোডশেডিংয়ের কারণে এর জনপ্রিয়তা আরো অনেক বেড়েছে। বর্তমানে শুধু গৃহবাসী নয়, দোকানি বা ব্যবসায়ীদের কাছেও এটি খুব দরকারি ও প্রিয় একটি পণ্য। এছাড়াও সব ধর্মের লোকের কাছে মোমবাতি সমানভাবে সমাদৃত। বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে তাই মোমবাতির প্রচলন অত্যাধিক। মোমবাতি জ্বালিয়ে জন্মদিন পালন করা হয়। কিন্তু এত উপকারী একটি পণ্য তৈরির কলাকৌশল আমরা অনেকেই জানি না। জানলে হয়তো আমাদের মতো বিপুল বেকারের দেশে মোমবাতি শুধু একটি বাতি না হয়ে আত্মকর্মসংস্থানের একটি মাধ্যম হতে পারত। সাদা মোম বা প্যারাফিন, স্টিয়ারিক এসিড, সুতি সুতা, রং, সয়াবিন তেল, কড়াই, পাত্র, ছুরি, কাঁচি, চামচ, মগ, বালতি, প্যাকেট কাগজ, লেবেল আর আঠা, সাথে একটি ডাইস-এগুলো হলেই শুরু করা যায় মোমবাতির ব্যবসা। ডাইস বা ছাঁচের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে বাজারে বিভিন্ন ধরনের রেডিমেইড ছাঁচ পাওয়া যায় যাদের দাম অনেক বেশি। তবে নগরীর মোগলটুলীসহ বিভিন্ন স্থানে থাকা লোহার ওয়ার্কশপগুলোতে সাশ্রয়ে ডাইস বানাতে পারবেন। তবে ডাইস কিনলেন, মোমবাতিও বানালেন। তবে বিক্রি করবেন কীভাবে? এ ব্যাপারে কালা মিয়া বাজারের মোমবাতি ব্যবসায়ী জমির উদ্দিন জানান, তৈরি যেকোনো ধরনের মোমবাতি নিজেরাই বিক্রয় ও বাজারজাত করা যায়। নিজেরা বিভিন্ন দোকানে তা সরবরাহ করলে মুনাফাও বেশি পাওয়া যায়। আবার ঘরে বসেও মোমবাতি বিক্রয় করা যায় তবে এতে লাভ একটু কম হতে পারে। কারণ যারা ঘরে এসে মোমবাতি কিনে নিয়ে যায় তারা আবার দোকানিদের কাছে গিয়ে বিক্রি করে। সরাসরি দোকানে গিয়ে বিক্রি করলে পাইকারি ক্রেতাদের লাভের অংশটুকু নিজেদের কাছেই থাকে। মোমবাতি প্যাকেট করে বাজারজাত করতে পারলে ভালো। কারণ এতে মোমবাতির গুণাগুণ নষ্ট হয় না। আর প্যাকেটের সাথে যদি লেবেল ব্যবহার করা যায় তবে আরও ভালো হয়। কারণ বাজারে যেখানে নানা ধরনের মোম আছে সেখানে এত মোমের মাঝে নিজের মোমের প্রচার হবে। তবে বাজারজাত করার সময় মনে রাখা উচিত যে মোমবাতি খুবই ভারি বস্তু। তাই দোকানে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাইসাইকেল ব্যবহার করা ভাল। আর মোমবাতি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বাকিতে বিক্রি যতটা এড়ানো যায়, তত ভালো। কারণ পরে বাকি টাকা তোলা খুব কষ্টকর হয়ে পড়ে।

কম্যুনিটি সার্ভিস

বাচ্চাদের স্কুল ঠিক করা, বাসার কাপড় আয়রণ+ওয়াশ, ময়লা ব্যবস্থাপনা, বুয়া ম্যানেজমেন্ট, বাজার করা, যেকোনো কিছু মেরামত, বাসা পরিবর্তন, গৃহশিক্ষক প্রদান প্রভৃতি কম্যুনিটি সার্ভিসও এখন এক ধরনের ব্যবসায়ের মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এক্ষেত্রে কাজ করা বা কাজ খুঁজে দেয়ার বা কাজের মানুষ খুঁজে দেওয়ার বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন বা সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়ে থাকে। শুধু একটু প্রচার আর জনসংযোগ থাকলেই হয়, খুব কম সময়েই ভালো মুনাফা এনে দিতে পারে এ ধরনের উদ্যোগ।

ডে কেয়ার সেন্টার

কর্মজীবী মা-বাবা তাদের সন্তানের দেখাশোনার জন্য সকালে অফিসে যাবার আগে ডে কেয়ার সেন্টারে রেখে যান এবং বিকেলে-সন্ধ্যায় ফেরার পথে নিয়ে যান। এমনও হয়ে থাকে যে, ডে কেয়ার সেন্টারের পক্ষ থেকে সকালে নিজস্ব পরিবহনের মাধ্যমে বাচ্চাদের নিয়ে আসা হয় এবং সন্ধ্যায় বাড়ি পৌছে দেয়া হয়। এসব ডে কেয়ার সেন্টারে বাচ্চাদের খাবার (মেন্যু অনুযায়ী), ওষুধ, সাধারণ শিক্ষা, বিনোদন, খেলাধুলা, দেখাশোনা, পরিচর্যার বিনিময়ে ভর্তি ফিসহ মাসিক একটি ফিস নেয়া হয়। কর্পোরেট পৃথিবীতে এই ব্যবসাটির প্রসার এবং সম্ভাবনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গিফট আইটেম

গিফট আইটেমের দেশে খুব অভাব। যেকোনো ইভেন্ট-অকেশনে সুন্দর গিফট দেবার কিছু পাওয়া যায় না। এই সবের একটা ব্যবসা করা যেতে পারে। এটার মূল থিম হতে পারে দেশি এবং পরিবেশবান্ধব পাটের আইটেম, মাটির আইটেম, কাপড়ের ওপর নকশি কাজ, চামড়ার আইটেম, ঘরে বানানো কাগজের গ্রিটিংস কার্ড, সিরামিকের ওপর নকশা, বাঁশ-বেতের আইটেম, শুকনো ফুল, উপহারের ঝুঁড়ি, বাচ্চাদের জন্মদিনে দেবার গিফট ইত্যাদি।

নার্সারি

ফল ও ফুল গাছের চারা উৎপাদন করা আরেকটি ভালো ক্ষেত্র। হতে পারে মাশরুম বা অর্কিডের চাষও। প্রচলিত নার্সারি থেকে একটু সরে গিয়ে ঘর সাজানো গাছপালা, বনসাই, বিভিন্ন রকমের ফলের (স্টারফ্রুট, স্ট্রবেরী, চেরী ইত্যাদি) খামারও করা যেতে পারে।

মোবাইল লোড

এটি ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা নামে পরিচিত। একটি একাউন্ট আর কিছু টাকা জমা দিয়ে, একটি টেবিল চেয়ার নিয়ে এই ব্যবসা শুরু করে দেয়া যায়। বিভিন্ন অপারেটর বিভিন্ন মানের কমিশন দিয়ে থাকে।

লন্ড্রি (ওয়াশ-আয়রন) সার্ভিস

কোনো নির্দিষ্ট একটি জায়গায় ওয়াশিং ও আয়রণ প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে। নিজস্ব পরিবহন এবং জনবল দ্বারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাপড় সংগ্রহ করে এনে তা কাস্টমারের চাহিদা অনুযায়ী ওয়াশ, আয়রণ ইত্যাদি করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবার হোম ডেলিভারি দেয়া যায়। আবার এটা না করে একটি ছোট দোকান নিয়ে বসলেও হয়।

বায়িং হাউস-বুটিক শপ

আমাদের দেশের তৈরি পোশাক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। এ সুযোগে বিদেশি ক্রেতার কাছে দেশের তৈরি পোশাক বিক্রির জন্য অনেকেই বায়িং হাউস দিচ্ছেন। তাই সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে মাঝারি শিল্পদ্যোগের ক্ষেত্রে বায়িং হাউসের ব্যবসা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ ব্যবসাটিতে পুঁজি অবশ্য তুলনামূলকভাবে একটু বেশি লাগে। তারপরও অপেক্ষাকৃত মাঝারি বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে বায়িং হাউস করতে আগ্রহী এখন অনেকেই। ছোট পরিসরে বায়িং হাউস প্রতিষ্ঠা করেছেন বাকলিয়ার আরিফুল হক। তার মতে, ‘এই ব্যবসাটা মূলত যোগাযোগ দক্ষতার ওপরই নির্ভর করে। এর বাইরে পণ্যের গুণগত মান ঠিক রেখে গ্রাহককে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে কি না পরবর্তী সময়ে ব্যবসার ক্ষেত্রে এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’ আবার বুটিক শপও করা যেতে পারে। চট্টগ্রামের নারী উদ্যোক্তাদের কাছে বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে এই বুটিক শপের ব্যবসা অনেকদিন থেকেই বেশ জনপ্রিয়।

csonglap,net

আরও পড়ুন

ঘরে তৈরি হ্যান্ড স্যানিটাইজার কতটা কাজে আসে?

newsdesk

করোনা : চট্টগ্রাম বিভাগের ১৮ জনসহ আরও ৮৮ মৃত্যু

newsdesk

কী আছে মুনিয়ার সেই ডায়েরিতে?

newsdesk
error: Content is protected !!