Chattogram Songlap
'স্মৃতিতে অম্লান' - স্কোয়াড্রন লীডার এম, আফাযুর রহমান।

‘স্মৃতিতে অম্লান’ – স্কোয়াড্রন লিডার এম আফাযুর রহমান

মুহাম্মদ শাহীদুল আলম: বড় মানে বুঝি বয়সে বড়, অভিজ্ঞতায় বড়, সমাজের হিতকামী, চিন্তা-চেতনায় বড়। তাই বড়জন সবসময় উপদেশ দিয়েই চলে। বড় জন ভালো করে জানে উপদেশ না দিলে ছোটরা পথভ্রষ্ট হবে তাই শুরু করতে হবে প্রথম থেকে, যেখান থেকে শুরু করেছিল তার অনেক অনেক আগেকার পূর্ব পুরুষেরা। আজ আমার এই লেখনীতে এমন একজন ন্যায় বিচারক, ব্যক্তির উপদেশ, আদর্শ, ব্যক্তিত্ব, সংগ্রাম, ত্যাগ, অবদান, অর্জন, বিসর্জন সম্পর্কে তুলে ধরার ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। যা আমাকে আজকের এই পর্যন্ত আসার সুযোগ করে দিয়েছে। বলছিলাম…সমগ্র বাংলাদেশ, ফটিকছড়ি তথা নানুপুর গ্রামের অহংকার, নানুপুরের কৃতি সন্তান, ফটিকছড়ির শত শত মানুষের চাকুরিদাতা, বৃটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর প্রথম বাঙালি মুসলিম বিমান সেনা মরহুম স্কোয়াড্রন লীডার এম, আফাযুর রহমান সাহেবের কথা।

আমার এই লেখনী নব্বই দশকের পরবর্তী প্রজন্ম তথা নব-তরুণদের জন্য। কারণ অতীত যাদের থেকে হারিয়ে যাচ্ছে তারা কখনো বর্তমানের প্রজন্মকে কিছু দিয়ে যেতে পারে না। তাই মহাজ্ঞানীদের মহা বাণী থেকে- জন ল্যাঙ্ক হন বলেন, “ভবিষ্যৎকে জানার জন্যই আমাদের অতীত জানা উচিত”। যদি অতীত ভুলে যায় তাতে ব্যাহত হবে সঠিক ধারণা বা বিকাশ, সমাজের প্রগতি ও ঐক্য। বড় জনদের উপদেশের মধ্যে শুধু জ্ঞান প্রকাশের ইচ্ছাই লুকিয়ে আছে তা শুধু নয় বরং নিজের অভিজ্ঞতা ও সে জ্ঞান দিয়ে যেতে চায় তার উত্তরসূরীদের। আজকের এই ক্ষণে সেই ক্ষণজন্মা মহান পুরুষ এম. আফাযুর রহমান সাহেব আমাদের মাঝে নেই কিন্তু ফটিকছড়িবাসীর জন্য তাঁর অবদান, সুনাম আজো যুগ যুগ ধরে নানুপুর, ফটিকছড়িবাসীর হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছে।

ধার্মিক পিতা হাজী আবদুল মজিদের সুযোগ্য সন্তান মরহুম স্কোয়াড্রন লীডার এম আফাযুর রহমান নানুপুরের সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে ১৯১৪ সালের আগষ্ট মাসে জন্ম গ্রহন করেন। তিনি শৈশবে রোসাংগিরী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। যাঁর সুখ্যাতি রয়েছে ফটিকছড়ির নিরব দানবীর হিসাবে। কথায় আছে আর লোকমুখে শোনা.. ” আইয়ুব খানের শাসন, শেখ মুজিবের ভাষণ” দুই দিগন্তের দুই সিংহ পুরুষ যদি এক ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ লোক হয় তাহলে ব্যপারটা অন্যরকম অনুভূতি জাগে।

শুধু কি এই দুই মহানপুরুষ? না – শুধু তাই নয় আমরা যারা সময়ের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক মঞ্চে, পাঠ্যপুস্তকে যেসব খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গের নাম শুনি বা জেনেছি বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজ উদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সহ যাদের সাথে এম. আফাযুর রহমান সাহেবের ছিলো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এমনকি এ.কে খাঁন, জেনারেল আইয়ুব খাঁন, জেনারেল মুসা খাঁন, ফজলুল কাদের চৌধুরী, গর্ভনর স্যার ফিরোজ খানুনের সাথেও ছিলো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। যাঁর চিন্তা চেতনায় রয়েছে প্রিয় নানুপুর, ফটিকছড়িবাসীকে নিজের অবস্থান থেকে সহযোগিতা করা, তাইতো তিনি চট্টগ্রাম “ষ্টীল মিলস্”-এ যেভাবে পেরেছেন লেখাপড়া না জানা লোক শুধু ফটিকছড়ি বাড়ি শুনে চাকরি দিয়ে দিয়েছেন, শতশত লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দিয়েছেন, কখনো বিনিময় চেয়েছেন এমন কোনো রেকর্ড নেই অথচ এখনকার সময়ে একজন পিয়নের চাকরির জন্যও লক্ষ লক্ষ টাকা গুনতে হয় বাকীগুলো নাইবা বললাম। স্বার্থ ছাড়া এখনকার সময়ে হাসিও দিতে চাই না, চাকরি দিবে তো আকাশকুসুম কল্পনা করা।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিম পাকিস্তানি নরপশুদের তান্ডবলীলা চালায়নি এমন কোনো জায়গা নেই, নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে, ধরে নিয়ে যায় এলাকার জোয়ানদের।এই সংকট মুহুর্তে তিনি যেহেতু তৎকালীন পাকিস্তান এয়ারফোর্সের অফিসার ছিলেন সেহেতু তাঁকে সংগত কারনে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, তাঁর অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়। কিন্তু উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে যে, ঐ সংকটকালীন সময়ে নিজের জীবন ও পরিবারকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে এলাকার জনসাধারণের জীবন রক্ষার্থে তিনি নিজেকে দ্বৈত ভুমিকায় উপস্থাপন করেন। একদিকে যেমন উপদেষ্টা হিসাবে রাতের অন্ধকারে এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের নীল নকশা তৈরী করেছেন, অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানীদের অর্পিত দায়িত্বে নিজেকে নিয়োজিত দেখিয়ে নিজ এলাকায় হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে হানাদারদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।

ওনার এই সাহসীপূর্ণ দ্বৈত ভুমিকা পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের নিকট প্রশংসিত হয়। যার স্বীকৃতি স্বরূপ ওনাকে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গঠিত পূর্বাঞ্চলীয় এরিয়ার যুদ্ধাপরাধ তদন্ত বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার অর্পণ করেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।

হতে পারতেন শিল্পপতি, হতে পারতেন বিশাল ধন-সম্পদের মালিক কিন্তু দুর্নীতি-ঘুষ কখনো তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি ফলে জীবনের শেষ সময় কেটেছে আর্থিক টানাপোড়েনে তবুও কারো কাছে মাথা নত করেন নি। সম্পদ হিসেবে রেখে যান সুযোগ্য সন্তানদের। একজন ন্যায় বিচারক হিসেবে সমাজে আজো দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন তিনি, অন্যায়কে অন্যায় বলেছেন কখনো অন্যায়কে পশ্রয় না দিয়ে, কে আপন কে পর সেদিক বিবেচনা না করে ন্যায়ের পথ বেচে নিয়েছেন যা ত্রিশ বছর- পরে এসেও উনার সুনাম অক্ষুণ্ণ রয়েছে। তৎকালীন সময়ে তিনি রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন, সে সময়ে চীনের প্রধানমন্ত্রী “চৌ.এন. লাই” যখন সর্বপ্রথম পাকিস্তান আগমন করেন জেনারেল আইয়ুব খানের সাথে বিমান বাহিনীর পক্ষে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উনার ভূমিকা অতুলনীয়। শিক্ষাকে সবসময় প্রাধান্য দিতেন, আমাদের নানুপুর আবু সোবহান উচ্চ বিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা অর্জন করে ভালো অবস্থানে আছেন। কেউ ডাক্তার, প্রকৌশলী, ব্যাংকার, শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশ,সেনা,নৌ,বিমান বাহিনীতে, এমনকি আছেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। কিন্তু কেউ তো জানেননা যখন এই বিদ্যালয়টি সরকারী মঞ্জুরী ও নিবন্ধনকরণ পাওয়ার ব্যাপারে প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পরে সেইদিন এম. আফাজুর রহমান সাহেবই এই বিদ্যালয়ের নিবন্ধনকরণের ব্যবস্থা করেন। অথচ আমরা অতীত ভুলে গেলেও অন্তত যাঁরা বয়োজ্যেষ্ঠ তাঁদের উচিত কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বর্তমানকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। নাজিরহাট ডিগ্রী কলেজ, নাজিরহাট আলিয়া মাদ্রাসা, ফটিকছড়ি ডিগ্রী কলেজ ও নানুপুর লায়লা-কবির ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আফাযুর রহমান সাহেবের অবদান অনস্বীকার্য। কথিত আছে, বিশিষ্ঠ দানবীর, শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক, আলহাজ্ব রফিকুল আনোয়ার সাহেব আফাযুর রহমান সাহেবের শরণাপন্ন হলে বলেন তিনি (রফিক সাহেব) নানুপুরবাসীর জন্য কিছু করে যেতে চান তখনই আফাযুর রহমান সাহেব রফিক সাহেবকে উৎসাহিত করেন এই এলাকায় একটি কলেজের বড্ড প্রয়োজন। কারণ এতদূর নাজিরহাট কলেজে পুরুষরা যেতে পারলেও কিন্তু মহিলারা উচ্চ শিক্ষা থেকে অবহেলিত, আর এই কলেজ হলে এলাকারও সুনাম হবে তখনই মনস্থির করলেন উনার বাবা মায়ের নামে কলেজ দেওয়ার অবশেষে সেটা সফল হন প্রতিষ্ঠিত হয় লায়লা-কবির কলেজ। এম. আফাযুর রহমান সাহেব ছিলেন লায়লা-কবির কলেজের পরিচালনা পরিষদের সম্মানিত প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

এম আফাযুর রহমান সাহেব বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘকালীন সময় পরিচালনা পরিষদের সম্মানিত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
* নানুপুর মজহারুল উলুম গাউছিয়া ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা পরিচালনা পরিষদের সম্মানিত সভাপতি।
* নানুপুর লায়লা কবির ডিগ্রি কলেজ পরিচালনা পরিষদের সম্মানিত সভাপতি।
* নানুপুর আবু সোবহান উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সম্মানিত সভাপতি।
কর্মময় জীবনে সফর করেছেন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, সৌদিআরব, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড সহ বিভিন্ন দেশ।
তিনি শুধু জাতি ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে গেলেন। রেখে গেলেন অসংখ্য গুণগ্রাহী তাঁর উপযুক্ত সন্তান-সন্তুতি। যাঁর সুযোগ্য সন্তানরা আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। পরিচয় একটাই আমরা এম. আফাযুর রহমান সাহেবের সন্তান। সব সন্তানরা আজ স্ব-স্ব অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। ফটিকছড়ি তথা নানুপুরবাসীর জন্য সাধ্যের মধ্যে অকাতরে সমাজসেবা ও দান করে যাচ্ছেন আফাজুর রহমান সাহেবের কনিষ্ঠ সন্তান বিশিষ্ট দানবীর, শিক্ষানুরাগী সমাজসেবক আলহাজ্ব মুহাম্মদ আতিক হায়দার। এই ক্ষণজন্মা মহান পুরুষ প্রথম বাঙালি মুসলিম বিমান সেনা স্কোয়াড্রন লীডার এম আফাযুর রহমান সাহেব ১৯৯২ সালের ১লা জুন ফটিকছড়িবাসীকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান। আল্লাহ উনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের আলা মকাম দান করুক। আমিন।।

* IN SERVICE:
# Graduated from Royal Air Force Training Schools, Poona (INDIA).
# Undergone numerous course of instructions and participated in seminars on Personal Management, Administration, Organization and Methods, Security & Intelligence etc.
* SERVICE CAREER:
“””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
# AIR FORCES: Joined the then Indian Air Force in December, 1940.
Commissioned ( In the Special Duties Administrative Branch) in May, 1945.
# Served as O. i/c Records, Adjutant Recruiting Officer, Staff Officer (Personnel); Officer Commanding Administrative Wing etc. at Group H.Q…Air H.Q..and General H.Q.
(Air Force Recruiting Officer i/c East Pakistan from March, 1950 to December, 1953).
# Retired as substantive Squadron Leader from Pakistan Air Force on and 1st August, 1961.
*CIVIL:
“”””””””””””””””'””””””””””'”””””””””””””””””
# Dy. Director, Personnel and Training E.P. WAPDA from August, 1961 to February, 1967.
# Personnel Manager, EPIDC Chittagong Steel Mills from February, 1961 to December 1968.
# Secretary, CHITTAGONG CLUB LIMITED, from September, 1969 to March 1971.
# General Manager PYLON GROUP OF INDUSTRIES (Nationalized) Chittagong, comprising Pylon Industries, Karilin Silk Mills Ltd….Eastern Textiles Ltd…..and zaritex Ltd….from February, 1973.

শাহীদুল আলম
(লেখক ও শিক্ষক)
নানুপুর মজহারুল উলুম গাউছিয়া ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা

csonglap,net

আরও পড়ুন

চট্টগ্রামে শনাক্তের হার একদিনের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ

newsdesk

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট দলে চট্টগ্রামের ইয়াসির, চমক শরিফুল

newsdesk

সেরা ধনীর তালিকায় কে কোথায়

newsdesk
error: Content is protected !!