Chattogram Songlap
আবুল হোসেন চৌধুরী : শিক্ষা-সেবায় স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব

আবুল হোসেন চৌধুরী : শিক্ষা-সেবায় স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব

  • মুহাম্মদ জুলফিকার হোসেন: 

তাঁর জীবনদর্শন ছিল সাদামাটা দিনযাপন। দুয়ার তাঁর সবসময় খোলা থাকতো সবার জন্য। যার জন্য যতটা পারতেন, করতেন। চাকরির জন্য সুপারিশ কিংবা এলাকার কোনো সমস্যা, প্রয়োজনটা যাই হোক- তিনি মন দিয়ে শুনতেন। সাধ্যমতো সহযোগিতা করার চেষ্টা করতেন। তাই তাঁর মৃত্যুর প্রায় দুই যুগের কাছাকাছি সময় পার হলেও দক্ষিণ চট্টগ্রামের কোনো প্রবীণ শিক্ষককে যখন তাঁর কথা বলা হয়, শ্রদ্ধাভরে বলেন- স্কুল ইন্সপেক্টর আবুল হোসেন মিয়া? বড় ভালো মানুষ ছিলেন।
বলছিলাম প্রাক্তন জেলা শিক্ষা অফিসার মরহুম আবুল হোসেন চৌধুরীর কথা। আমৃত্যু যিনি শিক্ষা বিস্তার ও সমাজসেবায় কাজ করে গেছেন। নিজ কর্মগুণে যার পরিচিতি নিজ এলাকা বাঁশখালীর গণ্ডি ছাড়িয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রাম, এমনকি কক্সবাজারসহ দেশের অন্যান্য জেলার অনেক মানুষের মধ্যেও বিস্তৃত ছিল।
১৯২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বাঁশখালী থানার মনকিচর গ্রামে জন্ম আবুল হোসেন চৌধুরীর। বাবা আলী মিঞা ব্যবসায়ী ও মা জমিলা খাতুন ছিলেন গৃহিনী। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন বড় এবং তাঁর ছিল আরো তিন বোন।
আবুল হোসেন চৌধুরীর পড়ালেখায় হাতেখড়ি মনকিচর প্রাথমিক স্কুলে। এরপর ১৯৩৪ সালে ভর্তি হন জলদী এম ই স্কুলে। পরে এই স্কুলটি বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত হয় এবং এই স্কুল থেকে তিনি ১৯৪১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিক (মাধ্যমিক) পরীক্ষা পাস করেন। একই বছর তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে আই.এ-তে (উচ্চ মাধ্যমিক) ভর্তি হন এবং এই কলেজ থেকে ১৯৪৩ সালে তিনি আই.এ পাস করেন। ওই বছরই তিনি একই কলেজে বি.এ-তে (স্নাতক) ভর্তি হন। ভর্তি হওয়ার আগে তিনি ভারতের দিল্লী যান এবং সেখানকার দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখেন।
দিল্লী থেকে ফিরে বাঁশখালীর চাম্বল ইউনিয়নের আশরাফ মিঞা চৌধুরীর বড় মেয়ে মাবিয়া বেগমকে তিনি বিয়ে করেন। তাঁর জীবনের বিশেষ এই দিনটি ছিল ১৯৪৩ সালের ১৯ জুন। পরে তাঁর এবং মাবিয়া বেগমের সংসার আলো করে আসে দুই ছেলে ও তিন মেয়ে।
আবুল হোসেন চৌধুরী চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৪৫ সালে বি.এ পাস করেন এবং একই বছর আইন পড়ার জন্য কলকাতায় যান। সেখানে ভ্রমণপ্রিয় এই মানুষটি নবদ্বীপ, মুর্শিদাবাদ, নবাববাড়ি এবং হুগলী এলাকা ঘুরে দেখেন। তবে এই ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে তাঁর হাতে থাকা টাকা শেষ হয়ে যায়, অন্যদিকে আইন কলেজে ভর্তির সময়ও পার হয়ে যায়। এ অবস্থায় নিজের খরচ চালানোর জন্য তিনি হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়া মহকুমার রথতলা এলাকার একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের চাকরি নেন। স্কুলটির উপদেষ্টা ছিলেন স্যার আশুতোষ মুখার্জির ছেলে নিখিল বঙ্গ হিন্দু মহাসভার সভাপতি রমা প্রসাদ মুখার্জি। কিছুদিন পরে তিনি চব্বিশ পরগণার আলীপুর মহকুমার পীরতলা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই স্কুলে চাকরিকালীন সময়েই তিনি ডেপুটেশনে বি.টি পড়ার জন্য ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজে ভর্তি হন। তবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে ওই বছরের ১৬ আগস্ট তিনি দেশে চলে আসেন এবং বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দেন। ১৯৪৭ সালে এই স্কুল থেকে ডেপুটেশনে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ভর্তি হয়ে বি.টি পাস করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৫২ সালে এই স্কুল থেকে বদলি হয়ে তিনি সরকারি মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগ দেন।
১৯৫৩ সালে তিনি সন্দ্বীপের থানা শিক্ষা অফিসার হিসেবে নিয়োগ পান। একই বছর তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। থানা শিক্ষা অফিসার পদে তিনি কক্সবাজার, সাতকানিয়া, ফটিকছড়ি ও চট্টগ্রাম সদরে চাকরি করেন। ১৯৬৭ সালে মহকুমা শিক্ষা অফিসার হিসেবে নীলফামারীতে এবং পরে কক্সবাজারে একই পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পেয়ে বরিশাল জেলায় বদলি হন।
এরপর তিনি চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-সহকারী পরিচালক (শিক্ষা) এবং ১৯৭৬ সালে পদোন্নতি পেয়ে নোয়াখালীতে জেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে যোগ দেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা শিক্ষা অফিসার ও সর্বশেষ ১৯৮২ সালে চট্টগ্রামের জেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে বদলি হন। ১৯৮৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন। একই বছর তিনি চট্টগ্রামের বাইতুশ শরফ আদর্শ মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও বাইতুশ শরফ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে যোগ দেন এবং দীর্ঘদিন তিনি এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ১৯৯৬ সালের ১৮ আগস্ট চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
ব্যক্তি জীবনে ধার্মিক এই মানুষটি দুইবার হজ করেন। বই পড়তে খুব পছন্দ করতেন তিনি। পছন্দ করতেন পরিবারের সবাইকে নিয়ে গল্প করতে, অবসরে নাতিদের হাত ধরে ঘুরে বেড়াতে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুণী এই শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট নিজ গ্রামে বাঁশখালী ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয়, মনকিচর প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ডাকঘর স্থাপন করেন। স্থানীয় শতাধিক বেকার শিক্ষিত যুবককে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। এলাকার গরীব-দুস্থ মানুষকে তিনি সবসময় সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করতেন। যেকোনো সামাজিক উন্নয়ন উদ্যোগে তাঁর সমর্থন-সহযোগিতা ছিল উল্লেখ করার মতো।
তাঁর স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে বাঁশখালীর শীলকূপ ইউনিয়নের প্রধান সড়কটিকে আবুল হোসেন চৌধুরী সড়ক নামকরণ করা হয়েছে।

লেখক: সম্পাদক, চট্টগ্রাম সংলাপ, মরহুমের নাতি
csonglap,net

আরও পড়ুন

চট্টগ্রাম নগরপ্রধানের দায়িত্বে যত মেয়র-প্রশাসক

newsdesk

চট্টগ্রাম সংলাপে খবর : দুইদিনেই গায়েব সেই আবর্জনার স্তূপ!

newsdesk

স্কুল-কলেজে ছুটি বাড়ল

newsdesk